সন্দেহরণ
১.
আজ মাহমুদের জেলে ঢোকার ৪৪তম দিন। ও মাত্র ১৬ বছরের ছেলে। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার জন্য মেসে থেকেছে ও। তাই মা-বাবার থেকে দূরে থাকার কারণে কান্নাকাটি একদমই করে নি। জেলে ঢোকার পর থেকে আজ পর্যন্ত মাত্র দুবার কেঁদেছে ও। ১২তম দিনে; যেদিন ও শুনল ওর মা বাবাকে সরকারিভাবে(?) মেরে ফেলা হয়েছে। ঐদিন ও প্রায় ঘন্টাখানেক বেহুঁশও ছিল। বলাবাহুল্য, বেহুঁশ কাঁদতে কাঁদতেই হয়েছিল। আর কেঁদেছিল প্রথম দিন।
প্রতিবার কাঁদার সময়েই আবুল চাচা ওকে সান্ত্বনা দিয়েছে। লোকটা নোয়াখালীর। তবে মনটা খুবই সাদাসিধে। ও যখন মা-বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে কাঁদছিল তখন তিনি সান্ত্বনা দিতে দিতে বলছিল, " কান্দিস কিয়েল্লাই? কান্দি কিছু অইত নো। আর ফরিবারের হগগলরে মারি আলাইছে। হেরা নাকি সরকারবিরুদি। আরে খালি খালি সন্দে করি ধরি নিআইছে। আই কিছু কর্তি পারি নো।
আল্লার কাছে ক। হেই আমগো আসল বান্দপ। হেরে কেউ মারতি পাইরত নো।"
চাচার সান্তনা পেয়ে আর তার কথা শুনে মাহমুদের আরো জোরে জোরে কান্না বেড়োতে থাকল। কান্নার শব্দে পাশের সেলের কয়েদীরাও ফিসফাস করতে লাগল। ব্যাপারটা আসলেই বেখাপ্পা। "সান্তনা কি কান্নার শব্দ বৃদ্ধির সমানুপাতিক নাকি বর্গের সমানুপাতিক?"
ব্যাপারটা গতকাল হতে ওর মাথায় কিলবিল করে দৌড়োচ্ছে। কাগজ-কলম হলে হয়ত একটা গাণিতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যেত। কিন্তু জেলে বসে তা অসম্ভব। কিছু কিছু জিনিস আছে যা জেলে বসে চাইলেই পাওয়া যায় না। কলম, টুথব্রাশ ক্ষেত্রবিশেষে সামান্য কাঠিও। কারণ, এগুলো দিয়ে কষ্টকরভাবে মৃত্যুবরণ করা যায়। আর কয়েদী যদি মরেই যায় তাহলে বিচার কার হবে? বিচারপতি বেকার হয়ে গেলে তো দেশ চলে না।
তবে মাহমুদের সুইসাইড করার কোন ইচ্ছাই নেই। সৃস্টিকর্তা যখন মারবেন তার আগে মরে লাভ কি! ওর চেয়ে আরো অনেকেই হয়ত বেশি কষ্টে আছে। পৃথিবীর সবাই নিজের কষ্টটাকে বড় করে দেখে। তবে কেউ কেউ কষ্ট লুকিয়ে রাখে হাসির আড়ালে। যেমন আবুল মিঞা । ওনার কথাবার্তা শুনলে বোঝাই যাবে না যে উনি পরিবার, ঘর মোটকথা সর্বস্ব হারিয়ে ফেলেছেন। গত কয়েক দিন আগের কথা। দুপুরবেলা জেলের ভেতরে কারো ঘুমোবার নিয়ম নেই। সবাইকে যার যার পছন্দমত কাজ করতে হয়। কোন কাজ না পারলে আবার একবেলার খাবার জুটবেনা। আবুল মিঞা গাছপালা লাগানো ও পরিচর্যার কাজ করেন। এখন আর জেলগুলো আগের মত নেই। একরুম হতে অন্য রুমে অনায়াসে যাওয়া যায়। কিন্তু জেলের বাইরে যাওয়া তো দুরে থাক ওকথা মনে মনে ভাবলেও খবর আছে। তো ওইদিন দুপুরে খাবার পরে আবুল মিঞা কাজে যাওয়ার পরিবর্তে সাব জেলারের রুমে গেল। কয়েক মুহুর্ত পরে হাতে করে একটা মোবাইল ও হেডফোন নিয়ে নিজের সেলে ঢুকল। মাহমুদ কাজ করতে যাবার জন্য আবুল মিঞাকে ডাকতে এসে দেখে সে কানে হেডফোন লাগিয়ে দিব্যি ঘুমুচ্ছে। কয়েক মুহুর্ত অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকার পর ও আবুল মিঞাকে ডাকা শুরু করল।
- আবুল চাচা! ও আবুল চাচা! কাজে যাবেন না? জেলার দেখলে কিন্তু জীবনে আর ঘুমাতে পারবেন না। ওঠেন!
- ডিচটাব কইচ নো। আই কামে যাইম না। তোর জেলার আরে কিছু কইত নো। হ্যাতে আরে গান হুনতি কইছে।
- কে বলেছে? আর এইসব এনেছেন কিভাবে?
- অইডা বুদ্দি থাইকলে আনা যায়। তুই বড় হলি আনবি।
- আর বড় হওয়া। ঠিক আছে, আপনি শোনেন আপনার গান।
- হুমমম।
বলে আবুল মিঞা গান শোনার তালে তালে হালকা করে ঠোঁট নেড়ে তাল মেলাতে লাগল। আর মাহমুদ তার দিকে চেয়ে মনে মনে ভাবল, "মনের সুখই সবচেয়ে বড় সুখ।"
২..
রাত দুটোর সময় হঠাৎ মাহমুদের মেসের রুমে ঠকঠক আঘাতের শব্দ। ভদ্র ঘরের কেউ এভাবে দরজা ধাক্কায় না। চোখ ডলতে ডলতে দরজা খুলেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল ওর। র্যাফ মানে র্যাপিড একশন ফোর্সেস এমনিতেই ওর পছন্দ নয়। কারণ কি এক রাজনৈতিক কারণে ওর দাদাকে নাকি এরাই মেরে ফেলেছিল ক্ষমতা দখলের সময়। এসব রাজনৈতিক প্যাঁচ ও কখনো বোঝেও নি আর বুঝতেও যায়নি। ওর বাবাই ওকে দুরে পাঠিয়ে দিয়েছে যাতে রাজনীতি ওকে না ছোঁয়। কি জানি এ্যালার্জি জাতীয় পদার্থ হয়ত।
তবে রাতদুপুরে ওর বাসায় আসার কারণটা কি তা ও একটু পরেই বুঝতে পারল। গত কয়েকদিন আগে ওর ফ্রেন্ডসওয়ার্ল্ড এর আইডি কাজ করছে না। হ্যাক হয়ে গেছে ভেবে ও আর ঢুকে নি। তবে ওর বন্ধু রাসেল বলেছিল আইডি ডিএ্যাকটিভ করে দিতে।
" হ্যাক হওয়া আইডি ডিএ্যাকটিভ করে কি করব? কাল আরেকটা খুলে নিলেই তো হবে।" ওর বন্ধুর সদুপদেশের জবাব।
" সমস্যা সেটা না। আমার এক চেনা জানা লোকের আইডি এরকম হ্যাক হয়ে গেছিল। ও আর ওটা বন্ধও করে নি। পরে দিনদুয়েক যেতে না যেতেই তাকে র্যাফে ধরে নিয়ে গেছে। বলছে সে নাকি জংগী সদস্য।"
বন্ধুর কথাগুলো সত্য প্রমাণিত হল যখন চোখের সামনে র্যাফ দাঁড়িয়ে।
"তুমি কি মাহমুদ?"
ওর ফ্লাশব্যাকের বারোটা বাজিয়ে জিজ্ঞেস করল একজন র্যাফ সদস্য।
"জি, হ্যাঁ।"
"তোমাকে আমাদের সাথে থানায় যেতে হবে।"
"কিন্তু আমিতো ক...."
ঠাস, ঠাস করে দুগালে দুটো চর খেয়ে বলতে যাওয়া কথা বেড়োল না ওর। চরের ধাক্কায় দরজার ওপর গিয়ে পড়ল।
"খানকির ছাওয়াল! মাদারচোদ! জংগী হইছোছ? জংগী পিছনদিক দিয়া ঢুকায়া দিমু!........"
ওর দিকে বুটের লাথি নিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে আরো কি কি যেন বলল লোকটা।
লাথি দিল বুকের ওপর। ধপ করে একটা শব্দ হতেই ওর ঘুমটা ভেঙে গেল। নিজেকে সেলের বিছানায় দেখে কিছুটা স্বস্তি পেল এই ভেবে যে "আরো কয়েকটা লাথি হতে এযাত্রা বাঁচা গেল।" সারাদিন কাজ করে একটু ঘুমিয়ে পরতেই যতসব স্বপ্ন শুরু হয়। তবে জীবনের কিছু ব্যাপার আজিবন স্বপ্নই থেকে যায়। বাস্তবে তার কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়না। আর কিছু স্মৃতি আজীবনের দুঃস্বপ্ন হিসেবে থেকে যায়।
বিছানা থেকে নেমে সিলভারের গ্লাসটা হতে কতটুকু পানি খেয়ে আবুল মিঞার বিছানার দিকে তাকাল। বরাবরের মতই নেই। এখন পর্যন্ত একদিনও ওনার আগে উঠতে পারেনি ও। একটু বাহিরে উকি দিতেই একজন সিকিউরিটি গার্ডকে দেখল ও। তাকে জিজ্ঞেস করল "ভাই আজকের তারিখ কত?"
সে একটু অগ্নিদৃষ্টি দিবে দিবে ভাব করে বলল " ১৭ আগস্ট।"
১৭ আগস্ট! আজকে তো ওর মা-বাবার বিবাহবার্ষিকী ছিল । ওদের পরিবার মধ্যবিত্ত হওয়া সত্বেও এইসব দিনগুলোতে বেশ আয়োজন করা হত। আজ আর আয়োজন-টায়োজন করা হবে না।
কেইবা করবে? মৃত মানুষের মৃত্যুবার্ষিকী মনে রাখা হলেও বিবাহবার্ষিকীর কথা কেউ মনে রাখে না। তার ওপর ক'দিন যাবৎ মাহমুদের শরীরটাও ভাল যাচ্ছে না। গত দুদিন ধরে ওর ডায়রিয়া হয় হয় ভাব। অনেকবার বাথরুমে যেতে হয়েছে। বাড়িতে থাকলে ওর মা এতক্ষণে পুরো ঘর মাতিয়ে ফেলত। ওর বাবাকে অফিস থেকে ছুটি নিতে বলত। তারপর ডাক্তার, কবিরাজ, বদ্যি সবাইকে দৌড়ের ওপর রাখত। ও যতটা না অসুস্থ থাকত, তার বেশি ওর মাকে মনে হত। মায়ের ব্যাপারটাই এরকম।
যদিও আবুল মিঞা ওকে জেলের বাগান হতে কি জানি পাতা এনে খাইয়েছে। এতটা তিতকুটে স্বাদের জিনিস ও ওর দাদার জন্মেও খায়নি। তবে স্বাদ যাই হোক ওর কিছুটা সুস্থ লাগছে এখন। যদিও ঘুমের রেশ ফুরোয় নি।
মেঝেতে রাখা সিলভারের গ্লাস হতে একটু পানি খেয়ে আবারো বিছানায় গা এলিয়ে দিতে গেল তখনই দেখল আবুল মিঞা কাকে যেন সঙ্গে করে নিয়ে আসছে। লোকটা সম্ভবত ওদের সেল থেকে চার পাঁচ সেল দুরে থাকে। সেলের ভেতর ঢুকেই আবুল মিঞা ওর কাছে এল। ওকে শুয়ে থাকাবস্থাই বলল, " কি ভাইস্তা। সুস্থ অইছত নি?"
"এইত। পুরোটা না।" জবাব দিল মাহমুদ।
"কিতা কস! ঠিক আছে আরেক ডোজ অসুদ খালি ঠিক অই যাবি। অহন একটা কাজ করা লাইগব। একটা চিডি লেহন লাইগব।" বলে সাথের লোকটাকে ইশারা করে আবার বলতে লাগল, "এই হইল গিয়া জাভেদ। অয় যেমনে কইব তেমনে লেইখা দিবি। এই ল' কাগজ-কলম।"
বলে জাভেদকে ওর পাশে বসিয়ে নিজে সেলের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।
কাগজ-কলম হাতে নিয়ে মাহমুদ শোয়া থেকে উঠে বসল। ততক্ষণে জাভেদও ওর পাশে বসেছে।
" হ্যাঁ কি লিখতে হবে বলুন।" জাভেদকে তাড়া দিল মাহমুদ।
"লিখবা একটা চিরকুট । তবে সংক্ষেপে লেখলেই হইবে।" জাভেদ মুল বিষয়বস্তু বুঝানোর জন্য একটু থেমে আবার বলতে শুরু করল। আর মাহমুদও সময় নষ্ট না করে লিখতে আরম্ভ করল।
"আমার এক ছোট ভাইয়ের ধারে। ব্যাপারডা এই যে তাকে কিছু জিনিস কিনতে হইবে। জিনিসগুলান হইল-
★মিষ্টি আলু
★লাল মরিচ
★হলুদ মশলা
★কাঁচা টমেটো
★ঘোড়ার নাক আর কিছু ভুট্টা।
টাকা যা লাগে তা স্বপ্নের একাউন্টে পুছিয়া যাইব। ইতি-টিতি লেখা লাগব না।"
জাভেদের চিঠি লিখতে লিখতে মাহমুদের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। জেল থেকে কেউ এধরনের চিঠি লিখতে পারে তা ওর ধারণার বাইরে। '২১ শতকের এই শেষে এসে মানুষ বড়ই উল্টাপাল্টা হয়ে গেছে। থাক যার যা ইচ্ছা করুক। ওর এখন একটাই চিন্তা। তা হল, "কিভাবে একটা স্বস্তির ঘুম দেয়া যায়।"
৩...
"ভাইস্তা ওই ব্যাটা ভাইস্তা। কত আর ঘুমাইবি? ওট, খাওন আনতি না?"
আবুল মিঞার ডাকাডাকিতে অবশেষে চোখ খুলল মাহমুদ। কখন যে ঘুমিয়ে পরেছিল তা মনে পরছে না ওর। জাভেদ নামক লোকটা যাওয়ার পরে ঘুমিয়েছিল এটুকু নিশ্চিত। চোখ পিটপিট করে আবুল মিঞার দিকে তাকাতে বলল, "ক'টা বাঁজে চাচা?"
"বাজাবাজিতে আমগো কাম নাই। চল খাওন নিয়াই।" সেই পুরনো ধাঁচের উত্তর আবুল মিঞার।
"আমার তো খেতে ইচ্ছে করছে না চাচা।"
"খাতি আবার ইচ্ছা করন লাগতো নি? এমনেই রোগা, না খাইলে আরো রোগে ধরব। চল উঠ।"
কিছুটা রাগমিশ্রিত গলায় আবুল মিঞা জবাব দিয়ে হাতে প্লেট নিয়ে খাবারের ঘরের দিকে চলল।
খাবার তেমন আহামরি নয়। আগের মত রুটি দুজন মিলে টেনে ছিড়তে না হলেও ডাল আগের মতই ঘোলা পানি রয়ে গেছে । ওরা দুজন এক টেবিলে বসে খাচ্ছিল এমন সময় দুজন র্যাফ ও তাদের সাথে জেলার খাবার ঘরে প্রবেশ করল। তারা ভেতরে ঢুকতেই কয়েদীদের হইচই নিমিষে থেমে গেল। সাধারনত এমন সময়ে এরা আসে না। জেলের ভেতরে যদি কোন ঝামেলা হয় অথবা কোন কয়েদী অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তবেই এদের শুভাগমন(!) হয়। ওনারা প্রবেশ করতেই হন্তদন্ত হয়ে সাব জেলারও প্রবেশ করল।
সকলের মাঝে পিনপতন নীরবতা। সবাই কিছু শোনার জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছে। অবশেষে সকলের অপেক্ষার প্রহর শেষ করে, নীরবতা ভঙ্গ করে জেলার বলতে শুরু করল,
" তোমাদের ভাল করার জন্য জেলে পাঠানো হয়। কিন্তু এখানে এসেও যারা ভাল হতে না পারে তাদেরকে সাড়ে তিন হাত মাটিতে গেঁড়ে ফেলা ব্যতীত কোন উপায় আমাদের কাছে অবশিষ্ট থাকে না।
এবার আসল কথায় আসি।"
হাতে একটি কাগজ মাথার ওপর উঠিয়ে আবার বলতে লাগল, "তোমাদের মধ্যে কার হাতের লেখা এই চিঠিতে? কে লিখছে এই চিঠি?" সবাইকে কোনমতে দেখার সুযোগ দিয়ে তিনি এবার চিৎকার করা শুরু করলেন,
"কে লিখেছে এই চিঠি? দশ সেকেন্ডের মধ্যে স্যারেন্ডার করো নয়তো সবকটার অবস্থা শোচণীয় করে ফেলব আমি। বলদ পেয়েছ আমাদেরকে?
মিষ্টি আলু মানে ককটেল,
লাল মরিচ - হাতবোমা
হলুদ মশলা- বোমা তৈরির রাসায়নিক
কাঁচা টমেটো- গ্রেনেড
ঘোড়ার নাক-রিভলবার
ভুট্টা- বুলেট। আমাদের এগুলো কি অজানা নাকি? কোডিং বেজড সিক্রেট মেসেজ করা হচ্ছে? বের হ তাড়াতাড়ি।"
চিঠির লেখা শোনার পর মাহমুদের পেটের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। কারন ওটা তো ওরই লেখা চিঠি। বিকেলে জাভেদ যেটি লিখিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।
ও আড়চোখে আবুল মিঞার দিকে তাকাল। দেখল, সে একদৃষ্টিতে খাবারের প্লেটের দিকে তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টি আকর্ষন করার জন্য কয়েকবার হালকা শিষ দিল ও।
কিন্তু তাতে ওনার দৃষ্টি আকর্ষন করা সম্ভব হলো না দেখে ওনাকে ডাক দিতে যাবে তখনই দেখল আবুল মিঞা হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে গেল।
"সার, আই লেকছি ওইডা।"
বলল সকলের দৃষ্টি নিজের দিকে নিয়ে।
ঘটনার আকস্মিকতায় মাহমুদের মুখ-চোখ সব হা হয়ে গেল।
আবুল মিঞা দোষ স্বীকার করার সাথে সাথেই জেলার তার সাথের র্যাফ দুজনকে ইশারা করলেন। তাদেরকে আবুল মিঞার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে মাহমুদ চিন্তা করল,
"আমার জন্য আবুল চাচার জীবনটা শেষ হয়ে যেতে পারে না। চিঠি আমিই লিখেছি, সুতরাং শাস্তি আমারই প্রাপ্য।"
ও ডেস্ক হতে উঠে বলতে যাবে তখনই আবুল মিঞা ওর দিকে ফিরল। তার চোখের কোণে হালকা পানির রেখা দেখা দিতেই সে চোখ ফিরিয়ে নিল। মাহমুদ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর ঘাড়ের জুগুলার ভেইনের ওপর প্রচন্ড বেগে আঘাত করলেন তিনি। মূহুর্তের মধ্যে ওর দুচোখ বুঁজে এল। ওর মনে হল যেন গভীর সমুদ্রের তলায় হারিয়ে ফেলছে নিজেকে।
4....
চোখে মুখে পানির ছিটা টের পেয়ে ধরফর করে উঠে বসল মাহমুদ। কয়েক সেকেন্ড লাগল ওর বুঝে উঠতে ঠিক কি ঘটেছিল আর ও জ্ঞানই বা হারাল কেন। সবকিছু মনে পরতেই ও উঠে দাঁড়াল। খাবার রুমের ভেতর গোটাদশেক লোক ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। সকলেই গুনগুন করে কথা বলছে। ওর কাছে অনেকটা সেই বহু পুরনো দিনের গানের মত মনে হল। ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখল তিনজন লোক আবুল মিঞার নিথর দেহটাকে স্ট্রেচারে করে ওঠাচ্ছে।
ওনার দুচোখের মাঝে একটা তৃতীয় নয়ন সৃষ্টি হয়েছে। দু'পাশের দু'চোখ দিয়ে হালকা অশ্রু এসে গাল বেয়ে পড়ছে। উনি কাঁদছিলেন। তাই তৃতীয় চোখটিও অশ্রু বিসর্জন দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেনি।
কিন্তু মানুষের অশ্রুর রং কি কখনো লাল হয়?
নাকি এটা আনন্দ অশ্রু? মুক্তির আনন্দ!!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন